int_fash_1

শুরু করা যাক নাহয় শেষ থেকে। অর্থাৎ পারি দিয়ে। কারণ ওস্তাদের মার তো শেষেই হয়ে থাকে। হ্যাঁ, সেই কাজটি করেছেন সদা তরুণ কার্ল লেগারফেল্ড। শ্যানেল আর লেগারফেল্ড যেন মানিকজোড়। দুজনে দুজনার। আর লেগারফেল্ড মানেই চমক। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ভারতানুরাগ বা সুপারমার্কেট ব্র্যান্ডিংয়ের মতোই এবারও ছিল একেবারে অন্য ধরনের থিম। চমকে দেয়ার মতোই বটে। লেগারফেল্ড এবার তৈরি করে ফেললেন শ্যানেল বুলেভার্ড। আর সেখানেই মিছিল হলো নারীশক্তির জয়জয়কারে মুখর। রানওয়ে বদলে গেল রাজপথে। কী অসাধারণ আইডিয়া। কার ডেলভি, জিজেল বুন্দসেনরা লাউড স্পিকার আর প্ল্যাকার্ড নিয়ে দিব্যি মিছিল করলেন ফ্যাশনের আপাত মোড়কে। আর সেসব প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল নানা সেøাগান: ‘মেক ফ্যাশন নট ওয়ার’, ‘টুইড ইজ বেটার দ্যান টুইট’, ‘হি ফর শি’, ‘হিস্ট্রি ইজ হার স্টোরি’, ‘বি ইয়োর ওন স্টাইলিস্ট’, ‘বয়েজ শুড গেট প্রেগন্যান্ট টু’ ইত্যাদি। রাজপথ মাতানো স্টাইলের এই শো ছিল উচ্ছ্বাস, আত্মবিশ্বাস আর উদ্দীপনায় টইটম্বুর।

স্মরণযোগ্য, এবার জাতিসংঘে ‘হি ফর শি’ ক্যাম্পেইনের সূচনা করেন তরুণ অভিনয়শিল্পী এমা ওয়াটসন। এই শো তারই অংশ বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। সেই ধারাবাহিকতায় সত্যিই এবার প্যারিস ফ্যাশন উইকে নারীবাদের সলতে উসকে দিয়েছে ফরাসি ফ্যাশন ব্র্যান্ড শ্যানেল। কার্ল লেগারফেল্ডের এই কালেকশনের আত্মবিশ্বাসী, তারুণ্যদীপ্ত এবং আভিজাত্যপূর্ণ পোশাকগুলো এককথায় ছিল নারীশক্তির প্রকাশক; নারীর কোমলতা ও কাঠিন্যের সুষম ভারসাম্যের পরিচায়ক। ছোট ছোট মেটালিক টাইলসের এমবেলিশমেন্টযুক্ত টি-শার্ট শেপড ইভনিং ড্রেসগুলো ছিল চোখধাঁধানো। টুইড ফ্যাব্রিকে তৈরি পোশাকের আধিক্য ছিল লক্ষণীয়। ট্রাউজার, ডাবল ব্রেস্টেড জ্যাকেট, বিভিন্ন ডিজাইনের স্কার্ট, ফ্রিঞ্জি সোয়েটার, লং অ্যান্ড শর্ট টুইড জ্যাকেট আর লং-কোটের প্রাধান্য ছিল শ্যানেলের এবারকার কালেকশনে।

প্যারিস ফ্যাশন উইকের শুরুতে বেলজিয়ান ডিজাইনার দ্রিস ফন নঁতে দেখিয়েছেন তাঁর ক্যারিশমা। খুব যতœ করে খেলেছেন প্রকৃতি নিয়ে। শো’র স্টেজ থেকে শুরু করে ডিজাইন করা পোশাকে মূর্ত ছিল প্রকৃতিপ্রাণিত ভাবনা। স্পঞ্জি মসে ঢাকা রানওয়েতে মডেলরা হেঁটেছেন গ্লিটারিং জুয়েল টোনড ব্রোকেড, ফ্লোরাল এম্ব্রয়ডারিযুক্ত সিল্ক আর মেটালিক টোনের শিফনে তৈরি নানা ধরনের পোশাকে। অন্যদিকে হাঁটু অব্দি উইলিয়াম শর্টস, নিয়ন ওয়েস্টকোট, ভিক্টোরিয়ান ফ্রক কোট আর মিডি স্কার্ট ছিল এবারকার ডিওরের কালেকশনের মূল আকর্ষণ। ভিক্টোরিয়ান থেকে স্পেস এজের মধ্যকার পুরোটা সময় তিনি জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেছেন তার ডিজাইন, কাট ও প্যাটার্নে। সফলও হয়েছেন শতভাগ। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা দেখা যায় ভ্যালেন্তিনোর ডিজাইনারওয়্যারে। আঠারো শতকের ইতালির শিল্পসংস্কৃতি এবং দর্শনীয় স্থানগুলো এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে অনুঘটক হিসেবে। শিফন আর অরগ্যাঞ্জার ওপর বাহারি লেসের ব্যবহারে ডিজাইনাররা সৃষ্টি করেছেন পোশাকের অনন্য শিল্পকলা। কিছু কিছু পোশাকে লক্ষ করা গেছে বিভিন্ন রঙ ও স্টাইলের ফ্লোরাল মোটিফ। ভ্যালেন্তিনোর বিশেষ এক উপস্থাপনায় দর্শকরা মনভরে উপভোগ করেছেন সমুদ্রতলের রূপকথা। তারামাছ, কাঁকড়া আর জাহাজের মোটিফে প্রিন্ট করা কাপড়ে তৈরি পোশাকগুলো যেন দর্শকদের নিয়ে গেছে সমুদ্রের কাছে। স্টেজে মনোক্রোম পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেঁটেছে রঙবাহারি পোশাকও। লেসে তৈরি সাদা রঙের পোশাকেরও একটি বিশাল সংগ্রহ ছিল ভ্যালেন্তিনোর। সংখ্যায় কম হলেও একেবারে বাদ পড়ে যায়নি ভ্যালেন্তিনোর ট্রেন্ডমার্ক লাল রঙের পোশাক। মজার ডিজাইনের কলারওয়ালা জ্যাকেট, শর্ট সিøভ শার্ট, লেসি স্কার্ট, প্লাংগিং নেকলাইনের মিনিড্রেস, বড় হাতাওয়ালা ফিনফিনে ম্যাক্সি ড্রেস, শর্ট সিøভ হাইকলার জাম্পস্যুট আর বিডওয়ার্কযুক্ত পোশাকগুলো যেন একেকটি মাস্টারপিস।

কোমলতাই নারীর শক্তিÑ এই চিন্তাকে তার ডিজাইনের মাধ্যমে উদ্যাপন করেছেন ডিজাইনার স্টেলা ম্যাককার্টনে। ব্লিচ করা সুতি কিউলোটস, হালকা প্যাস্টেল রঙা ওভারসাইজড জাম্পস্যুট, অ্যাসিমেট্রিক নিট ড্রেস দেখা গেছে তার পোশাক সংগ্রহে। অনুজ্জ্বল কালার প্যালেট, মজার ডিজাইন করা কাটআউট, মিসম্যাচ প্রিন্টের এম্ব্রয়ডারি আর অ্যাপ্লিকের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার পোশাকে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। সেন্ট লরেন্ট বরাবরের মতোই দর্শকদের উপহার দিয়েছেন একদম ‘পয়সা উশুল’ শো। রুপালি টারবান, শিয়ার ব্ল্যাক টাইটস, স্টারস্টাডেড ক্রেপ ড্রেস, চকচকে পিপটো প্ল্যাটফর্ম, লাল ব্লকহিলÑ সবই ছিল মনোমুগ্ধকর। আরও ছিল কালো টাক্সেডো স্যুট, পিনস্ট্রিপ ব্লেজার, ক্রপড এবং বাটনড আপ জ্যাকেট এবং অ্যানিমেল প্রিন্ট মিনি স্কার্ট। ফ্যাশন হাউজ কেনজোর ফ্যাশন প্রেরণায় ছিল ওয়াইড ট্রাউজার, সোয়েটশার্ট, লেজার কাট কটন, ডেনিম আর স্বচ্ছ ফ্যাব্রিক। ওভারসাইজড টপসের সঙ্গে ওভারসাইজড স্কার্ট ও ট্রাউজার, প্যাস্টেলের সঙ্গে প্যাস্টেল, বেলুনের মতো ঢাউস হাতার ড্রপ শোল্ডার টপস দিয়ে ডিজাইনাররা দেখিয়ে দিয়েছেন, এমনটা তারাই পারেন। প্যারিস ফ্যাশন উইকের শেষ দিনে ফ্যাশন ব্র্যান্ড মিউ মিউ মাতিয়েছে মঞ্চ। যাদের প্রেরণায় ছিল পঞ্চাশের দশক। সে সময়কার জনপ্রিয় সার্কেল স্কার্ট এবং হাই ওয়েস্ট ট্রাউজার দেখা গেছে মডেলদের পরনে। তবে আঙ্গিকে ছিল সমসময়ের প্রভাব। সঙ্গে ছিল চটকদার বিপরীত রঙের মিশেলে তৈরি ক্রপ টপস।

মিলান

ডিজাইনার স্টেলা জিনের কালেকশন দিয়ে পর্দা ওঠে মিলান ফ্যাশন উইকের। বেল স্কার্ট, ট্রাউজার আর লুজ জ্যাকেট ছিল তার এবারকার কালেকশনের মূল আকর্ষণ। ফটোরিয়েলিস্টিক, হলোগ্রাফিক কিংবা বিভিন্ন রকম প্রাণী, ডাচ প্রিন্ট ফিশ আর ঝোপঝাড়ের বিমূর্ত রূপÑ পোশাকের জমিনে সবই হয়েছে ছাপার প্রেরণা। মিলান ফ্যাশন উইকে আরমানি ছিলেন বরাবরের মতোই অনন্য। তার এবারকার কালেকশনে প্রাধান্য পেয়েছে তারুণ্যোচ্ছল স্পোর্টি ডে ওয়্যার। আর সন্ধের পার্টিওয়্যারে ছিল রাফল এবং ঔজ্জ্বল্যের উপস্থিতি। আরমানির ব্লু বেসড একটি উপস্থাপনায় দেখা গেছে প্লে শ্যুট, স্ট্রাইপড মিড থাই ড্রেস এবং পিঠখোলা পোশাকের মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী। গ্যাদারড ব্যাক জ্যাকেট, হেম ব্লেজার আর প্লিটেড ঢোলা ট্রাউজারও দেখা গেছে এই কিংবদন্তির কালেকশনে। শোতে মডেলরা পরেছিলেন নীল কাটআউট ট্রেইনার; এ ছাড়া টারকোয়েজ সেল স্যান্ডেলগুলোও নজর কেড়েছে ফ্যাশনিস্তাদের। এ ছাড়া মেটে রঙের শিফন আর সিল্কের রাজত্ব দেখা গেছে আরমানির শোতে। ছিল উপল-ধূসর রঙ। মাসকুলিন ট্রাউজার শ্যুট, লং ড্রেস, পালাজ্জো প্যান্টস আর গোড়ালি অব্দি স্কার্ট দিয়ে আরমানি সবাইকে ফিরিয়ে নেন নব্বইয়ের দশকে। এবারকার ফ্যাশন উইকে ফেন্দির ডল সাইজড মিনিয়েচার ব্যাগ ছিল আলোচনার শীর্ষে। প্যাস্টেল রঙের এসব ব্যাগ ছিল রঙিন পাথরখচিত এবং ফুলেল এম্ব্রয়ডারিযুক্ত। এগুলো এতটাই নজরকাড়া ছিল যে পোশাক নয়, সবাই তাকিয়েছে ওই ব্যাগের দিকেই। তবে মানতে হবে, ফেন্দির পোশাকেও ছিল বৈচিত্র্য। শর্ট সিল্ক ড্রেস, অরগ্যাঞ্জা প্লিটেড ম্যাক্সি স্কার্ট, ফেদারড শর্ট ড্রেস আর ক্লিয়ার প্লাস্টিকের লেয়ারযুক্ত প্যাস্টেল নিটওয়্যারগুলো কোনো অংশেই কম ছিল না। প্রাদার শোতে চোখে পড়েছে ব্রোকেড প্রীতি। উনিশ শতকের প্রায় ত্রিশ ধরনের জনপ্রিয় প্যাটার্নের ব্রোকেডের রেপ্লিকা দিয়ে ডিজাইনার মিউসিয়া প্রাদা তৈরি করেছেন তার এবারকার কালেকশন। ব্রোকেডে তৈরি হয়েছে নানান কাট ও প্যাটার্নের হাঁটু অব্দি জামা আর স্কার্ট। এ ছাড়া লেদার দিয়ে তৈরি কিছু কোট এবং জাম্পারও চোখে পড়েছে ফ্যাশন ব্র্যান্ডটির এবারকার সংগ্রহে। প্রাদার মডেলদের পায়ে দেখা গেছে মোজা দিয়ে পরা হাইহিল এবং বুটেড জুতা। পোশাকের সহজাত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন ফ্যাশনবোদ্ধাসহ সাধারণ দর্শকরা। মোটা রিমের কালো চশমায় মডেলদের বেশ দেখাচ্ছিল ডি স্কয়ারড-এর স্প্রিং-সামার কালেকশনে। কালার ব্লকিং, বিডযুক্ত হুডি, কালো আর ধূসর স্পোর্ট শর্টস, সফট প্লিটেড ফুল স্কার্ট আর ব্রাইট প্রিন্টেড চমৎকার পোশাক ছিল শোর প্রধান একটি আকর্ষণ। দোনাতেল্লা ভারসাচি বরাবরের মতো এবারও ছিলেন চমকপ্রদ। ব্লক কালারড সোয়ারভস্কি পাথরে তৈরি মিনিড্রেস, ক্রপ টপ এবং স্কার্টে আভিজাত্যের ছোঁয়া টের পাওয়া গেছে শতভাগ। লেজার কাট লেদার জ্যাকেট আর স্কার্টগুলোও ছিল মনোমুগ্ধকর। নিট সিল্কে তৈরি গোলাপি, কালো, নীল ও লাল রঙা মিনি ড্রেসগুলো পুরো কালেকশনে যোগ করেছিল নতুন মাত্রা। গোল্ড মেটাল হার্ডওয়্যারে তৈরি নতুন প্রিন্ট উদ্ভাবন করেছেন দোনাতেল্লা, যা তার এবারকার উপস্থাপনায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। মিলান ফ্যাশন উইকের শেষ দিনে বিখ্যাত ডিজাইনার যুগল ডলশে ও গাবানা আবারও দেখিয়েছেন তাঁদের মুনশিয়ানা। ব্যাগি হট প্যান্ট, ফুলেল বিডের নকশাযুক্ত হাই ওয়েস্টেড শর্টলেস, ফার ফ্রিঞ্জড পঞ্চ, সাইক্লিং শর্ট ছিল তাঁদের এবারকার সংগ্রহে। এই জুটির ডিজাইনÑ কালো লেসের এম্ব্রয়ডারি করা জ্যাকেট আর ট্রাউজারও ছিল নজরকাড়া। মারনি তাঁর কালেকশনে খেলেছেন নানান ফুলেল মোটিফ নিয়ে। পুচির শোতে ছিল বেশ কিছু চমক। ব্র্যান্ডটির টাইডাই করা সিল্কি-শিফন ম্যাক্সিতে মঞ্চে দেখা গেছে নাওমি ক্যাম্পবেল, নাতাশা পলি ও কেন্ডাল জেনারকে। বহু বছর পর ফের মঞ্চে হেঁটে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এককালের টপ মডেল জেমা ওয়ার্ডও। জীবন্ত বারবি ডলের দেখা মিলেছে এবারের মিলান ফ্যাশন উইকে। মিসোনি হাউজের ডিজাইনের প্রেরণাই ছিল এই প্লাস্টিক আইকন। গোলাপি চামড়ায় মোড়ানো টুইন স্টে, লোগো টি-শার্ট, বারবি টি-শার্ট, মিনি বাইকার ব্যাগ, জিনস আর আয়নাযুক্ত আইফোন কভার ছিল পুরো কালেকশনে। বারবির রোলার স্কেটিং, জগিং থেকে শুরু করে প্রতিদিনকার লুক মঞ্চে সফলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ডিজাইনার জার্মি স্কট।

লন্ডন
int_fash_2

এই প্রথম ডিজাইনার লুইস উইলসনকে ছাড়াই পর্দা ওঠে লন্ডন ফ্যাশন উইকের। সেন্ট্রাল সেন্ট মার্টিনসের এমএ কোর্সের ডিরেক্টর লুইস এবার ছিলেন না বটে, তবে অভাবটা বুঝতেই দেননি তাঁর শিক্ষার্থীরা। জ্যাকি লি, ক্রিস্টোফার কেন, জনাথন সন্ডারস, রিচার্ড নিকোল, রোকসান্দা ইলিনসিচ, মেরি কাতরানজাউসহ অনেকেই মঞ্চ মাতিয়েছেন নিজ নিজ শীলিত সৃজনে। লেমিনেটেড কটন আর হাইব্রিড উলের তৈরি গরম উপযোগী হালকা পোশাক দিয়ে শুরু হয় লন্ডনের স্প্রিং-সামার ২০১৫ সেশন। যেখানে ডিজাইনার জ্যাকি লির তৈরি পোশাকগুলোতে দেখা গেছে মিনিম্যালিস্ট শেপ ম্যানিয়া। কালেকশনে থাকা মিউলেট হেম ড্রেস থেকে শুরু করে ফ্লেয়ারড টপসগুলোতে সুস্পষ্ট ছিল নানা রকম জিওম্যাট্রিক প্যাটার্ন ও শেপ। ফ্লোরাল প্যাটার্ন প্রয়োগের আধুনিক তরিকাও দেখিয়েছেন জ্যাকি। ফলে পোশাকে কোবাল্ট ব্লু, নেভি ব্লু ও সাদা পেটাল প্রিন্ট ছিল মনমাতানো। লন্ডন ফ্যাশন উইকে এবারই প্রথম মঞ্চে ওঠে ফখ ফার লেবেল ‘শ্রিম্প’। ‘ফান, ফ্লাফি অ্যান্ড সুইট’ থিমে করা কালেকশনে প্রাধান্য পেয়েছে মোলায়েম স্যাটিনের পাতলুন, লেপার্ড প্রিন্টের জ্যাকেট, ফখ দিয়ে তৈরি স্যান্ডেল আর পার্ল ট্রিমড ফ্লাফি ক্লাচ। পোশাকে হলুদ আর উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। নিউইয়র্কে ছিল কলারড ড্রেসের বাহবা। কিন্তু লন্ডন হেঁটেছে উল্টোরথে। সন্ডারস তাঁর শোতে জামা থেকে গোটা কলারটা ফেলে দিয়ে তৈরি করেছেন ছেলেদের প্যাটার্নের ক্লাসিক শার্ট। আরও ছিল কিমোনো ধাঁচের বেল্ট বাঁধা জ্যাকেট। সঙ্গে ট্রাউজার অথবা স্কার্ট। পোশাকগুলোতে নজর কেড়েছে পাতার মোটিফে তৈরি ম্যাট কাটআউটস। ফ্যাশনে এবার স্পোর্টি লুক ভীষণ জনপ্রিয়। লন্ডনেও তা প্রমাণিত হলো আরেকবার। প্রিন-এর শোতে দেখা গেছে স্পোর্টিওয়্যারের এক অভূতপূর্ব আনকোরা নমুনা। এই নিরীক্ষা চকচকে ডে ওয়্যার আর ককটেল ড্রেসকে দিয়েছে সহজাত স্বাভাবিক স্পোর্টি টুইস্ট। শোতে ব্যবহার করা হয়েছে ক্লাসিক সাদাকালো ডুরে প্যাটার্ন, ওভারসাইজড ক্রিকেট জাম্পার, সুইম শ্যুট, ট্র্যাক প্যান্ট, এমনকি নাইলনের স্পোর্টি ব্যাকপ্যাকও। ফ্যাশন ব্র্যান্ড টপশপের শোতেও দেখা গেছে ফ্যাশনেবল স্পোর্টিওয়্যারের উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনা। যা দেখে মনে হচ্ছিল, মাত্র ময়দান থেকে র্যাম্পে উঠে এসেছেন মডেলরা। হলিউডের রেড কার্পেট লুক র্যাম্পের টি স্কেল জোনে ফুটিয়ে তুলেছেন অ্যানটনিও বেরারডি। অ্যাসিমেট্রিক স্কার্ট, মেটালিক ব্রোকেডের জ্যাকেট আর গ্যাজার সিল্কের তৈরি বেঢপ জ্যাকেটে সেটাই প্রতীয়মান হয়েছে সুন্দরভাবে। রোকসান্দার কালেকশনে ছিল সহনীয় টেকনোকালার ক্ল্যাচের জাদু। তার শোতে মঞ্চে দেখা গেছে নিয়ন লালের সঙ্গে বিসমল গোলাপির যুগলবন্দি, পাউডার ব্লুর সঙ্গে পিপারমেন্ট গ্রিনের সহাবস্থান। ম্যারি কাতরানজাউ-এর শো দেখে মনে হচ্ছিল, মঞ্চজুড়ে যেন কোনো জুওলজি ক্লাস চলছে। যেখানে মডেলরা হেঁটেছেন কালো ম্যাগমাসদৃশ চকচকে রাবার চিপের তৈরি মঞ্চে। তাতে মিনি ড্রেস, শিফট ড্রেসসহ বিভিন্ন নকশায় তৈরি সান্ধ্যপোশাক। লেসের নৈপুণ্যে আর ক্রিস্টালের চমকে নানা রঙের ফলিয়েজ মিথলজিক্যাল ব্যাঙ, কোরাল আর ট্রপিক্যাল মাছের ছোটাছুটি পোশাকে ফুটিয়ে তুলেছেন ডিজাইনার। সঙ্গে ছিল গ্লিটারিং প্যানেলিং, অরগ্যাঞ্জা হেম আর এম্ব্রয়ডারির নজরকাড়া নাটকীয়তা। ফ্রক, লেস আর ফেমিনিটি। যেন একে অন্যের পরিপূরক। এরডেমের শোতে এর কোনোটারই কমতি ছিল না। কালো, সবুজ আর অ্যাসিড হলুদে তৈরি পোশাকগুলোতে গাঢ় রঙের লেস, এম্ব্রয়ডারি, এমবেলিশমেন্ট আর হ্যান্ডকাটের ব্যবহারে অনেকটাই প্রকট ছিল নারীসুলভ স্বাভাবিক। অন্যদিকে, খাকি, চায়না, ব্লু, গ্রে, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট আর রেড স্ট্রাইপের মডার্ন ক্লাসিক পোশাকে র্যাম্প মাতিয়েছেন পল স্মিথের মডেলরা। গোল গলার শার্ট, লেদার ফ্রিঞ্জড টিউনিক, প্লিটেড স্কার্ট আর ঢোলা, স্ট্রাইপড, শর্টÑ মূল কালেকশনে প্রাধান্য ছিল সহজ পরিধেয়ের। এবারের লন্ডন ফ্যাশন উইকে উইডন চই বাতলেছেন, কী করে গরমের দিনে কালো পোশাক পরে তৈরি করা যায় স্টাইল স্টেটমেন্ট। তাঁর কালেকশনে আরও ছিল সিগারেট ট্রাউজার, রাফল দেয়া প্রিন্টেড টপ আর ওভারসাইজড ড্রপ শোল্ডার কোট। লুলু অ্যান্ড কোম্পানির পোশাকপ্রেরণায় ছিল ইউনিটি, ফ্রিডম আর সত্তরের জ্যাজ মিউজিশিয়ান সান রা। ডিজাইনার লুলু কেনেডির সিকুইন, স্পার্কল আর চটকদার রঙের ব্যবহারে মঞ্চে মূর্ত হয়ে উঠেছিল সত্তর। ত্রিশ বছরের ব্রাজিলিয়ান ডিজাইনার বারবারা কাসাসোলা ছিলেন এবারকার লন্ডন ফ্যাশন উইকের অন্যতম আকর্ষণ। তাঁর ডিজাইন করা উজ্জ্বল আর সাহসী রঙের পোশাকগুলোতে টেইলারিংয়ের মুনশিয়ানা উল্লেখ করার মতো। ডাবলড ওয়েভ, নাইফ প্লিট, সানরে স্টিচসহ নানা রকম প্লিটের বাহারি স্কার্ট ছিল পুরো কালেকশনে। সঙ্গে ছিল নানারঙা টাক্সেডো জ্যাকেটের যুগলবন্দি। আবার ঝা চকচকে গ্লিটার, চকচকে লেদার আর শিয়ার ফ্যাব্রিকে ঠাসা টম ফোর্ডের স্প্রিং-সামার ২০১৫ কালেকশন ছিল বরাবরের মতোই আলাদা। বারবেরির কাজেও ছিল চমক। প্রথা ভেঙে এবারের আসরে অনুপস্থিত ছিলেন ব্র্যান্ডটির সিগনেচার মডেল কারা ডেলভি। আর হাইহিল জুতা ছাড়াই বারবেরির মডেলরা জয় করেছেন এবারকার লন্ডন ফ্যাশন উইক। উইকের শেষ দিনে আনইয়া হিন্ডমার্চের স্টিকার ডিজাইনড এমবোশড করা হ্যান্ডব্যাগের কালেকশন মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। নিউইয়র্কের মতো লন্ডনেও ছিল ‘ফ্ল্যাট ইজ ফ্যাব’ মন্ত্রের জয়জয়কার। বারবেরি প্রোসামের লেস আপ স্নিকার এবং ফ্ল্যাট, রঙচঙে চামড়ার মোড়ানো স্যান্ডেল ছিল নজরকাড়া। ক্রিস্টোফার রেবার্নের মডেলদের দেখা গেছে ভেলক্রো স্ট্যাপড স্যান্ডেলে। ক্রিস্টোফার কেনের মডেলরা মঞ্চে উঠেছেন প্লাস্টিকের সিøপারে। ডিজাইনার জ্যাকেটের সঙ্গে এবার ট্রেন্ডভুক্ত হয়েছে ডার্ক ওয়াশড, সিøম কাটের ডেনিম জ্যাকেট। অ্যাকসেসরিজ হিসেবে দেখা গেছে বো’র ব্যবহার। কখনো কোমরবন্ধনীতে, তো কখনো মিনি মাউসের মতো মডেলদের মাথায় দেখা গেছে ঢাউস সাইজের বো।

ছবি: ইন্টারনেট

ক্যানভাস অনলইন