dress_2অন্য সব ইতিহাসের মতো ফ্যাশনের ইতিহাসেও সময়টা মুখ্য। তবে এখানে রয়েছে চমকপ্রদ ও হৃদয়গ্রাহী বিষয়। পুরোটাই মানুষকে নিয়ে। পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনধারা, সংস্কৃতিÑ সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকে ফ্যাশনের ইতিহাসে। পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, পোশাক-পরিচ্ছদের পরিবর্তনও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হয়েছে। সময় বদলের সঙ্গে মানুষ চারপাশের সবকিছুতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছে। তা পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে গয়না, জুতা, সাজগোজেও। আদিম গুহাবাসী মানুষের পরিধেয় ছিল গাছের পাতা, বাকল, পশুর চামড়া। আর সেখান থেকে প্রতিনিয়ত উৎকর্ষসন্ধানী মানুষ আজ চাঁদে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত পোশাক বানাতে সক্ষম হয়েছে।

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে লম্বা একটি লাইন। কোনো বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য টিকিট নেওয়ার জন্য। জানা গেল, ওয়েডিং একজিবিশন দেখতেই এমন ভিড়। দ্বিতীয় চিন্তা না করে আমিও হয়ে যাই লাইনের অংশ।
প্রথম ও দ্বিতীয় তলা মিলিয়ে ছিল পুরো প্রদর্শনী। প্রথম তলার ড্রেসগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় তলার ড্রেসগুলো অনেক দুর্লভ আর মূল্যবান হওয়ায় টিকিট কাটতে হয়েছিল।

মোট ৮০টি বিয়ের পোশাক এই প্রদর্শনীতে স্থান পায়। রোম্যান্টিক, গ্ল্যামারাস আর আভিজাত্যপূর্ণ এসব পোশাকের সঙ্গে স্থান পায় জুয়েলারি, ব্যাগ ও জুতা। বিশেষত পশ্চিমা বিয়ের পোশাকের ইতিহাসকেই তুলে ধরা হয়েছে একজিবিশনের মাধ্যমে। ছিল দারুণ কিছু গাউনও। সেই ১৭৫০ সালের রোকোকোর যুগের ট্যাফেটা, স্যাটিন, ডামাস্ক, সিল্ক দিয়েই তৈরি হতো প্যাস্টেল বা হালকা কোনো রঙের পোশাক। অভিভূত হতেই হয় তখনকার পোশাকের প্যাটার্ন দেখে। বিশেষ যে ঝুড়িতে করে মুরগি বহন করে বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো, এমন আকৃতির পোশাকও তখন তৈরি হতো। বলা হতো প্যানিয়ের। কনুই পর্যন্ত হাতায় থাকত পাখাসদৃশ কাফ।

১৭৯০-১৮২০। এটা ছিল ডিরেক্টরি আর রাজাদের জমানা। ফলে পোশাক প্রেরণায় ছিল গ্রিক আর রোমান সৃজনউৎস। সেই টিপিক্যাল ছোট হাতার তুলনায় উপরে ওঠানো ওয়েস্টলাইন। সাদা, প্যাস্টেল রঙের আধিপত্যে ব্যবহৃত হতো সুতি, মসলিন আর সিল্ক। প্যাটার্ন ছিল সূক্ষ্ম।

১৮২০-১৮৫০। রোম্যান্টিক যুগ। পরিবর্তনের সূচনা হলো এই কালপর্বে। ক্ল্যাসিক যুগের ঋজুতাকে উপেক্ষা করে ডিজাইনাররা উপভোগ করেন সৃজনের স্বাধীনতা। নিরীক্ষা চলে ওয়েস্টলাইন নিয়ে। হাতার দৈর্ঘ্য বাড়ে।

১৮৫০-১৮৬৯। ক্রিনোলিন পিরিয়ড। এই সময়ের মেয়েদের পোশাকে বেসিক শিলুয়েট উল্লেখযোগ্য। উপরের অংশ আঁটোসাঁটো। এরপর কোমর থেকে নিচের অংশ অর্থাৎ স্কার্ট অংশ ঢিলেঢালা। এর আকার বৃত্তাকার বা গম্বুজাকার। আর কাঁধের ঠিক নিচেই আর্মহোল। কাপড় ভারী হলেও শক্ত নয়। এখনো এই কাপড়ের চল রয়েছে নানা ধরনের পোশাকে। বিশেষত সান্ধ্য গাউনে।

১৮৭০-১৯০০। বাসল্ পিরিয়ড অ্যান্ড দ্য নাইনটিজ। বাসল আসলে একধরনের ফ্রেমওয়ার্ক। মেয়েদের পোশাকের পেছন দিকের ড্রেপারকে সঠিক আকার দেয়ার জন্য এটা ব্যবহার করা হতো। তবে ১৯০৫ সাল নাগাদ এটা একেবারেই হারিয়ে যায় বা বলা যেতে পারে অদৃশ্য হয়ে যায়।

dress_1১৯০১-১৯৯৯। এই সময়টাই ফ্যাশনের আধুনিক যুগ। মেয়েদের ভূমিকা বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই পাল্টেছে তাদের পোশাক। সাদা বিয়ের পোশাকের ট্রেন্ড এই সময়ে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। লেসের সংযোজনও এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। অভিজাত আর অন্যদের থেকে আলাদা বিয়ের পোশাক পরার ইচ্ছা যেমন তৈরি হয়, তেমনি ডিজাইনার্স ওয়েডিং কালেকশনের প্রতিও মানুষের আগ্রহ বাড়ে। এই প্রদর্শনীতে বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০০০-পরবর্তী সেই ধারা আজও অব্যাহত। দিন দিন বিয়ের ড্রেস নানাভাবেই মাত্রাময় হচ্ছে। বিশেষত সাদা পরার বাধ্যবাধকতা ক্রমেই কমে এসেছে।

১৭৭৫ থেকে ২০১৪। এই সময়ের বিয়ের ড্রেস নিয়ে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত বিয়ের ড্রেসগুলো না দেখলে গুণগত মান, চটক আর নান্দনিকতা সম্পর্কে কেবল ছবি থেকে অনুধাবন করা দুষ্কর ছিল। এখানে নির্ঘণ্ট অনুযায়ী পোশাকগুলো ডিসপ্লে করা হয়েছে। স্থান পেয়েছে ডাচেস অব কর্নওয়েল, কেট মস, ডিটা ফন টেসে, গোয়েন স্টেফানিসহ বিখ্যাতদের বিয়ের পোশাক। এর সঙ্গে আরও কিছু পোশাক নির্মাণের বিস্তারিত- ইলাস্ট্রেশন থেকে পূর্ণাঙ্গ পোশাক তৈরির ধাপ দেখানো হয়েছে। আর ছিল ডাকসাইটে ডিজাইনার ক্রিস্টিয়া লুবোটিনের অনিন্দ্যসুন্দর সব অ্যাকসেসরিজ। প্রদর্শনীতে বিখ্যাত ডিজাইনারদের মধ্যে ভিভিয়েন ওয়েস্টউড, জন গ্যালিয়ানো আর ভেরা ওয়াঙের ব্রাইডাল কালেকশন ছিল সবচেয়ে বেশি। এখানে প্রথাসিদ্ধ পোশাকের পাশাপাশি, ছিল প্রথার বাইরের পোশাকও। ইলাস্ট্রেশন ছাড়াও বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে কাপড়ের নমুনা। কীভাবে এসব সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা কৌতূহলকর।

লেখক: ডিজাইনার, টিম সোর্সিং কোম্পানি লিমিটেড

ছবি: লেখক

ক্যানভাস অনলাইন